Skip to main content

বিতর্কিত দেশবিভাগ ও সিলেটকে পাকিস্তানের অংশে দেওয়া


দেশবিভাগ ভারতবর্ষের সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ ঘটনা। অনেক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং হতাশাজনক ঘটনা ছিল দেশবিভাগে। এর মধ্যে সবচেয়ে হতাশার ছিল বাংলা ভাগ। বাংলা ভাগ ছিল সবচেয়ে বড় কুটনৈতিক ব্যার্থতা। বাংলাকে পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গে ভাগ করা হয়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গে আসাম এবং পূর্ববঙ্গ নিয়ে গঠিত হয়েছিল আসাম-বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি। ১৯১২ সালের বঙ্গভঙ্গ রদের পরবর্তী সময়ে বিভক্ত বাংলা এক হয়ে যায় এবং আসাম একটি আলাদা প্রদেশ হয় এবং বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে আসাম,বিহার এবং উড়িষ্যা আলাদা করে দেয়া হয়।১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের ভিত্তি ছিল ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা। তখন বাংলা এবং পাঞ্জাবে গণভোটের আয়োজন করা হয়। বাংলায় সিলেট একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা যা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ আসামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সিলেটের লোকজন সিলেটি বা বাংলায় কথা বলত যেখানে এই প্রদেশের বাকি লোকজন আসামি ভাষায় কথা বলত। আসাম সরকার মনে করত সিলেট কে সরিয়ে দিলে এটা জাতীয়তা এবং ভাষার দিক থেকে বেশি স্বদেশী হবে এবং ফলে অধিক শক্তিশালী হবে। আসামের প্রধানমন্ত্রী গোপিনাথ বরদলই ১৯৪৬ সালে বলেন যে তার ইচ্ছা “সিলেটকে পূর্ব বঙ্গে হস্তান্তর করা”।সিলেটে গণভোটের কারণ দেখানো হয় সিলেট কি আসাম-এর সাথে থাকবে এবং নতুন দেশ ভারতের সাথে যুক্ত হবে নাকি পূর্ব বঙ্গ-এর সাথে যুক্ত হয়ে নতুন দেশ পাকিস্তানে যোগ দেবে তা নির্ধারণ করা।গণভোটের প্রশ্ন ছিল- সিলেট কি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত পূর্ববাংলায় যোগদান করবে? 



সিলেট গণভোট ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ও ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে ৩ জুলাই এ বিষয়ে সরকারি ঘোষণা দেয়া হয়েছিল।বৃহত্তর সিলেটের মহকুমা ছিল পাঁচটি। এগুলো হলো সিলেট উত্তর, সিলেট দক্ষিন(মৌলভীবাজার), হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ এবং করিমগঞ্জ। নির্বাচন পরিচালনার জন্য এইচ. সি. স্টর্ক‌কে রেফারেন্ডাম কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। নির্বাচনের জন্য ২৩৯টি কেন্দ্র ঠিক করা হয়। এতে মোট ৪৭৮ জন প্রিসাইডিং অফিসার ও ১৪৩৪ জন পোলিং অফিসার ছিলেন। সিলেটের গনভোটে গড়ে ৫৬.৫৬% মানুষ একটি নতুন দেশে যুক্ত হবার ইচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু এর মধ্যে বৃহত্তর সিলেটের করিমগঞ্জ সাবডিভিশন আসামের অংশ হয়ে যায় এবং বাকি অংশ পূর্ব বঙ্গের অধীনে চলে আসে। কিন্তু মজার বিষয় গণভোটের ফলাফল ছিল কিছুটা ভিন্ন। সিলেটের পাঁচটি মহকুমার চারটি-সিলেট উত্তর, হবিগঞ্জ, করিমগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জ পুর্ব বঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দেয়। শুধুমাত্র মৌলভীবাজার যা সিলেটের দক্ষিন অংশ নামে পরিচিত ছিল, তারা ভারতের অংশ হবার ইচ্ছা প্রকাশ করে। করিমগঞ্জ মহকুমায় ১,০০,২৪৩ ভোটারের মধ্যে ৪১,২৬২ জন পূর্ব বঙ্গের পক্ষে এবং ৪০,৫৩৬ জন ভারতের পক্ষে ভোট দেয়। অন্যদিকে সিলেট দক্ষিন(মৌলভীবাজার ) মহকুমায় ৭৯,০২৪ জন ভোটারের মধ্যে ৩১,৭১৮ জন পূর্ব বঙ্গের পক্ষে এবং ৩৩,৪৭১ জন ভারতের পক্ষে ভোট দেয়। সিরিল র‍্যাডক্লিফ কমিশনের ভাষ্য ছিল একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট কেও মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যায় করিমগঞ্জ সাবডিভিশন এবং এর আশেপাশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা ভারতের অংশে চলে যায়। যদিও তৎকালীন মৌলভীবাজার মহকুমা ভারতের সাথে থাকার পক্ষে ভোট দিলেও তা কার্যকর হয়নি। ভারত বিভাজনের সময় সিলেট জেলার করিমগঞ্জ মহকুমার সাড়ে তিন থানা এলাকা (রাতাবাড়ী, পাথরকান্দি, বদরপুর ও করিমগঞ্জ থানার অর্ধেক) বাদে বাকি অংশ পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে চলে যায়।



বাংলার এভাবে কিছু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ভারতের অংশে এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পূর্ব বঙ্গের অংশে কুটনৈতিক কারণে হস্তান্তর করা হয়।করিমগঞ্জকে ভারতের সাথে যুক্ত করার কয়েকটি কারন উত্থাপন করা হয়। বলা হয়ে থাকে ত্রিপুরার সাথে ভালো যোগাযোগ থাকার সুবিধা দিতে করিমগঞ্জকে ভারতের অংশ করা হয়। এছাড়াও দেশভাগের প্রাক্কালে, মুসলিম লীগের পাশাপাশি কংগ্রেসেরও হিংসাত্মক কার্যক্রম তীব্র আকার ধারণ করে, যদিও মুসলিম লীগ কিছুটা ভালো অবস্থায় ছিল। মৌলভী মজুমদার এবং বসন্ত কুমার দাস (তখন আসামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) উপত্যকা জুড়ে ভ্রমণ করে কংগ্রেসকে সংগঠিত করেন এবং ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হলে তার ফলাফল কি হতে পারে, সে বিষয়ে সমাবেশ করে জনগনকে শিক্ষিত করতে থাকেন। ১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি, মৌলভী মজুমদার শিলচরে আসাম জাতীয়তাবাদী মুসলিম কনভেনশনের উদ্বোধন করেন। এর পর, ৮ই জুন ১৯৪৭এ আরেকটি বড় সভা শিলচরে অনুষ্ঠিত হয়। উভয় সভাতেই, মুসলমানদের একটি বড় অংশ উপস্থিত ছিলেন, যা তাদের একটি সুবিধাজনক অবস্থান দেয়। আসামের বরাক উপত্যকাকে, বিশেষ করে করিমগঞ্জকে, ভারতের সঙ্গে রেখে দেবার জন্য যাঁরা উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। মজুমদার সেই প্রতিনিধি দলের নেতা ছিলেন, যাঁরা রাডক্লিফ কমিশনের সামনে এই দাবি জানিয়েছিলেন যে, সিলেটের (বর্তমানে বাংলাদেশে) একটি অংশ (বর্তমানে করিমগঞ্জ জেলা), মুসলমান অধ্যুষিত হওয়া সত্বেও যেন ভারতে থাকে। সবশেষে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ভারত স্বাধীনতা আইনের ধারা ৩ মোতাবেক গণভোট সংক্রান্ত কার্যক্রমের বৈধতা দেওয়া হয়। 







More From Takesence:


Comments

Popular posts from this blog

এমবিভার্ট (ambivert) কি ? what is ambivert ?

আমাদের মাঝে কেউ কেউ ইন্ট্রোভার্ট হয় আবার কেউ হয় এক্সট্রোভার্ট অর্থাৎ কেউ খুব মিশুকে হয়(Extrovert) কেউ আবার নিজের মত একা থাকে(Introvert)। কিন্তু এদের মাঝামাঝি আরেক ভাগ আছে যারা কখনো ইন্ট্রোভার্ট আবার কখনো এক্সট্রোভার্ট। এদেরকে বলা হয় এমবিভার্ট। জীবনে চলার পথে সবচেয়ে বেশি সমস্যা এমবিভার্টদের হয়। যারা এমবিভার্ট তারা মাঝে মাঝে খুব হৈ চৈ করতে ভালোবাসে আবার মাঝে মাঝেই একা থাকতে ভালোবাসে।এরা সহজে সবার সাথে মিশে যায় কিন্তু তবুও এদের অনেক ফ্রেন্ড থাকেনা আবার এরা একদম একাও থাকেনা। গুটিকয়েক ফ্রেন্ড নিয়েই এরা থাকে। এদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো শত কষ্ট হলেও এরা মুখ ফুটে বলবেনা কিছু আপনাকে। বরং সেই কষ্ট সহ্য করেই হাসিমুখে থাকবে। তাই এদের মন খারাপ হলেও সেটা মুখে না বলা পর্যন্ত আপনি সেটা ধরতে পারবেননা। ওদের একটা আলাদা জগৎ থাকে। নিজেদের চারপাশে এরা একটা দেয়াল বানিয়ে নেয়।সে জগতে আপনি চাইলেই প্রবেশ করতেই পারবেননা। বরং সেখানে প্রবেশ করার চাবি হচ্ছে আপনার ভালোবাসা আর ভরসা করার মতো ভালো ব্যবহার। এমবিভার্টরা যাকে ভালোবাসে তাকে খুব মন দিয়ে ভালোবেসে ফেলে। আর তাই কষ্টটাও বেশ...

ইন্ট্রোভার্ট , এক্সট্রোভার্ট এবং অ্যাম্বিভার্ট এর পার্থক্য? Difference between an introvert , an extrovert and an ambivert?

ইন্ট্রোভার্ট : ছোট ছোট কথা উপভোগ করে না  ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সাথে অল্প সময়ের জন্য বাইরে থাকা উপভোগ করে নিজেকে আবার চাঙা  করার জন্য একা সময় প্রয়োজন আশপাশ সম্পর্কে পর্যবেক্ষন কাজ করার আগে চিন্তা করা এক্সট্রোভার্ট : চিন্তা করার আগে কাজ করা আশেপাশে মানুষ থাকালে খেয়াল না করা  খুব বেশি সময় একা থাকা বিছিন্ন বোধ করা চিন্তা এবং অনুভূতি নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করে সাধারণত ভাল নেতা অ্যাম্বিভার্ট নতুন মানুষের সাথে মিটিং উপভোগ করা  তবে পছন্দের এক বন্ধুর সাথে থাকা আগ্রহের বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে বেশি পছন্দ করা মানুষের সাথে অতিরিক্ত সময় থাকলে  ক্লান্তিকর হতে পারে একটি পার্টিতে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া "ব্যালেন্স আউট" এ ভাল - কারো কারো সাথে কথা কম বলা , চুপচাপ এমন কারো সাথে বেশি কথা বলা